‘আলফা মেল’ ও ‘টক্সিক পুরুষত্ব’—সাম্প্রতিক ভারতীয় সিনেমায় শব্দ দুটি বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে রণবীর কাপুর অভিনীত ‘অ্যানিম্যাল’-এর পর বলিউড ও দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় এমন পুরুষ চরিত্রের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। পর্দায় তাদের দেখা যায় পেশিবহুল শরীর, বেপরোয়া আচরণ, সহিংসতা এবং মৃত্যুভয়হীন এক মানসিকতায়।
এই ধারায় এসেছে একের পর এক বড় বাজেটের অ্যাকশন সিনেমা। তারই সাম্প্রতিক সংযোজন যশ অভিনীত ‘টক্সিক’। ২৬ আগস্ট মুক্তির পর ছবিটি ঘিরে দর্শকদের উচ্ছ্বাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি সিনেমাটির গল্প, নারী চরিত্রের উপস্থাপন, অতিরিক্ত সহিংসতা ও নেতিবাচক রিভিউ মুছে দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।
ছবি মুক্তির পর বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহের ভিডিওতে যশের ভক্তদের উন্মাদনা দেখা যায়। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এ ধরনের ভিডিও অনেক সময় সিনেমার প্রচারে বাড়তি ভূমিকা রাখে। তবে এর মধ্যেই কিছু ইউটিউবারের নেতিবাচক রিভিউ সরিয়ে দেওয়ার জন্য ‘টক্সিক’ টিম চাপ দিয়েছে—এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। যদিও অভিযোগটির সত্যতা স্পষ্ট নয়। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সিনেমা নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে এমন প্রচারণার প্রয়োজন হচ্ছে কেন।
কেমন হলো ‘টক্সিক’?
ছবির গল্পে খুব বেশি ঢুকলে স্পয়লার হয়ে যেতে পারে। তবে ট্রেলারেই গল্পের মূল আবহের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। যশ অভিনয় করেছেন রায়া চরিত্রে। ছোটবেলা থেকে তাকে আগলে রাখা বোন গঙ্গা চরিত্রে রয়েছেন নয়নতারা। রায়ার জীবনে রয়েছে সংঘাত, অপরাধ ও সহিংসতার দীর্ঘ ছায়া।
গল্পের অন্ধকার জগতে একে একে প্রবেশ করেন সালভাদোর, তার প্রেমিকা ও ভাই। সালভাদোরের আস্থাভাজন হয়ে ওঠে রায়া। পরে সালভাদোরের মেয়ে রেবেকার সঙ্গে রায়ার বিয়ের প্রসঙ্গ আসে। গল্পে নতুন মোড় তৈরি করে সার্কাস পরিচালনাকারী নাদিয়ার আগমন। রায়া ও নাদিয়ার মধ্যে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক, যার সঙ্গে যুক্ত হয় সম্পর্কের টানাপোড়েন ও নানা নাটকীয়তা।
ছবির প্রথমার্ধ কিছুটা দীর্ঘ মনে হলেও দ্বিতীয়ার্ধে যশের আরেকটি চরিত্র গল্পে গতি আনে। মূলত যশের উপস্থিতিই ‘টক্সিক’-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
যশের দাপটই ছবির মূল শক্তি
রায়া এমন এক চরিত্র, যার কাছে নীতি-নৈতিকতার চেয়ে ক্ষমতা ও নিজের নিয়ম বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মৃত্যুকেও সে খুব সহজভাবে নেয়। সিগারেট ধরানোর দৃশ্য থেকে শুরু করে অ্যাকশন সিকোয়েন্স—প্রায় প্রতিটি দৃশ্যেই যশকে তারকা ইমেজের সর্বোচ্চ ব্যবহার করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
তবে চরিত্রটির ভেতরে অপরাধবোধও কাজ করে। নিজের সহিংসতার পরিণতি সম্পর্কে তার উপলব্ধি রয়েছে। এই দ্বন্দ্বের জায়গায় যশ অভিনয়ের ভিন্ন একটি দিক দেখিয়েছেন। দ্বিতীয় চরিত্রটিতেও তার উপস্থিতি শক্তিশালী।
কিয়ারা আদভানি নাদিয়া চরিত্রে নজর কেড়েছেন। চরিত্রটির অতীত খুব বেশি ব্যাখ্যা করা হয়নি, তবে তার অভিনয়ে আবেগ ও জটিলতা ফুটে উঠেছে। নয়নতারা, তারা সুতারিয়া, হুমা কুরেশি ও অক্ষয় ওবেরয়ের পর্দায় উপস্থিতি তুলনামূলক কম হলেও প্রত্যেকেই নিজেদের জায়গায় কার্যকর। বিশেষ করে অ্যাকশন দৃশ্যে নয়নতারা প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
নারী চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন
‘টক্সিক’-এর অন্যতম আলোচিত বিষয় নারী চরিত্রগুলোর উপস্থাপন। একজন নারী নির্মাতার কাছ থেকে নারী চরিত্রের ক্ষেত্রে যে সংবেদনশীলতা প্রত্যাশিত, ছবিতে তা পুরোপুরি পাওয়া যায়নি—এমন সমালোচনা রয়েছে।
চলচ্চিত্রটির বড় অংশেই পুরুষ চরিত্রের দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেয়েছে। নারী চরিত্রগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে প্রধান পুরুষ চরিত্রের গল্পের সহায়ক কিংবা আকর্ষণের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে ‘মেল গেইজ’ বা পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নও উঠেছে।
রক্ত আর সহিংসতার বাড়াবাড়ি
ছবির নির্মাণশৈলীতেও রয়েছে অতিরিক্ত সহিংসতার ছাপ। কাটা মাথা, ঝুলন্ত লাশ কিংবা বিচ্ছিন্ন অঙ্গ নিয়ে দৃশ্য—সবকিছুই বেশ খোলামেলাভাবে দেখানো হয়েছে। বিশাল পরিসরের অ্যাকশন দৃশ্য দর্শকদের বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা করলেও কিছু সিজিআই দৃশ্য কৃত্রিম মনে হয়েছে।
সংলাপও তৈরি করা হয়েছে দর্শকদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া মাথায় রেখে। অনেক সংলাপের পরই প্রেক্ষাগৃহে সিটি বা করতালির সুযোগ রাখা হয়েছে। মুক্তির পর দর্শকদের প্রতিক্রিয়ায় সেটির প্রমাণও মিলছে।
তবে এখানেই মূল প্রশ্ন—একটি সিনেমা কি শুধু তারকা, অ্যাকশন, রক্ত আর উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্যের ওপর দাঁড়িয়ে বড় সাফল্য পেতে পারে? দর্শক কয়েক ঘণ্টার জন্য উত্তেজিত হতে পারেন, কিন্তু প্রেক্ষাগৃহ থেকে বের হওয়ার পর গল্পটিই যদি মনে না থাকে, তাহলে সেই সাফল্য কতটা স্থায়ী হবে?
‘টক্সিক’ তাই শুধু যশের অ্যাকশননির্ভর ছবি নয়; এটি একই সঙ্গে বর্তমান ভারতীয় সিনেমার একটি প্রবণতারও প্রতিচ্ছবি। যেখানে সহিংস পুরুষত্ব, অতিরিক্ত অ্যাকশন ও তারকাখ্যাতি বক্স অফিসের বড় অস্ত্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিনেমাকে টিকিয়ে রাখে গল্প ও চরিত্র। ‘টক্সিক’ সেই পরীক্ষায় কতটা সফল, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।


